চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে ‘চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাতে এক নতুন ও ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগে এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিল্পায়নের বিকাশ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সোমবার আনোয়ারায় সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সহজীকরণে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর অংশ হিসেবে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আসতে যাচ্ছে। তিনি জানান, বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে শতভাগ কার্যকর ‘সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিস’ চালুর পাশাপাশি পুঁজিবাজার ও মূলধনী খাতে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের আবাসন, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য একটি আধুনিক স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার স্থাপনের আহ্বান জানান চীনা অংশীদারদের প্রতি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আজ আনোয়ারার এই উর্বর মাটিতে সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আমরা শুধু এক কোদাল মাটি তুলছি না, বরং বাংলাদেশের শিল্প রূপান্তরের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছি।” তিনি বলেন, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই প্রকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
তিনি জানান, প্রায় ৭৭৬ একর (৩১৪ দশমিক ৩৯ হেক্টর) এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চলে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এখানে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলের পাশাপাশি বায়ো-ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য ও পানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চামড়াজাত শিল্প গড়ে উঠবে, যা দেশের রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করবে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকেও প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিইআইজেড কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র ৭০০ মিটার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এন-১ জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ থাকায় পণ্য পরিবহন হবে দ্রুত ও সহজ।

পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের অংশ হিসেবে এখানে আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল এফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং আধুনিক পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। পাশাপাশি বেজার ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে দ্রুত অনুমোদন, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সারোয়ার জামাল নিজাম, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান লি চ্যাংগুই এবং বাংলাদেশ সিইআইজেড কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান বক্তব্য দেন।
এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।