নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সোহাগ অপহরণ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণের পর নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও তার পরিবার। মামলার আসামিদের কয়েকজন প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন এবং মামলা তুলে নিতে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালের ১ জুন রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের সরকারি তোলারাম কলেজের সামনে থেকে ব্যবসায়ী নেতা ও মীম শরৎ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলহাজ্ব মোহাম্মদ সোহাগকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। পরদিন ২ জুন পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর এলাকার একটি ফেরিঘাটের কাছ থেকে তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় সোহাগের স্ত্রী তানিয়া আহাম্মেদ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলাটি ১২(০৬)২৫ নম্বরে এবং দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৪ ধারায় করা হয়।
চার্জশিটে ৭ আসামি
মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ায় তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আমলি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এম. সাইফুল ইসলাম অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। মামলার অভিযোগপত্র নম্বর ৩১৮। বাদীপক্ষের কোনো আপত্তি না থাকায় এবং উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—মো. আল আমিন শেখ ওরফে জিতু, মো. কবির হালদার, লতিফ সিদ্দিকী রতন, সাব্বির আহমেদ, ইরান হোসেন মোহন, মো. সাকিব হোসেন ও মো. ছাহাদ।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, তদন্তের সময় সাক্ষীদের বক্তব্য, বিভিন্ন আলামত, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ ও ডিজিটাল তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে। কয়েকজন আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
অপহরণের পর হুমকির অভিযোগ
সোহাগের করা একটি সাধারণ ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, অপহরণ মামলার আসামিদের জামিনে মুক্তির পর তাকে ও তার পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
গত ১২ জানুয়ারি ফতুল্লা থানায় করা ওই সাধারণ ডায়েরিতে সোহাগ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন অজ্ঞাতনামা নম্বর থেকে তাকে ও তার স্ত্রীকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। পাশাপাশি তার ব্যবসায়িক ছবি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার কথাও জিডিতে উল্লেখ করা হয়।
জিডিতে সোহাগ আরও দাবি করেন, এসব ঘটনায় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে সোহাগ বলেন, “আমি ও আমার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছি। এ রকম অবস্থা চলতে থাকলে আমার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। আমি ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ও ফতুল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
চার্জশিটের পরও তৎপরতার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, মামলার প্রধান আসামি হিসেবে চার্জশিটভুক্ত আল আমিন ওরফে জিতু এবং তার সহযোগীদের কয়েকজন নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর পক্ষের দাবি, তাদের চলাফেরা ও কথাবার্তায় ফের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আসামিদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। মামলাটি বর্তমানে বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, আসামিদের কয়েকজন প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও স্থানীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে তাদের অবস্থান সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে পুলিশি তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সোহাগের পক্ষের লোকজন ও ব্যবসায়ী মহলের কেউ কেউ।
তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ী মহলের দাবি, আলোচিত এই অপহরণ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে যদি নতুন করে হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগপত্র গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মামলার সংক্ষিপ্ত তথ্য:
ভুক্তভোগী—আলহাজ্ব মোহাম্মদ সোহাগ
বাদী—তানিয়া আহাম্মেদ
মামলা নম্বর—১২(০৬)২৫
থানা—ফতুল্লা মডেল থানা, নারায়ণগঞ্জ
ধারা—দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৪
অপহরণের তারিখ—১ জুন ২০২৫
উদ্ধার—২ জুন ২০২৫, পায়রা বন্দর এলাকা, পটুয়াখালী
অভিযোগপত্র নম্বর—৩১৮
চার্জশিটভুক্ত আসামি—৭ জন
অব্যাহতির সুপারিশ—৩ জন