নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার ম্যানেজারকে অপহরণ করে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে তাদের হাত-পা বেঁধে নরসিংদী এলাকার একটি সেতুর কাছে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা।
গত ২৭ জুলাই এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মো. সজিব আহমেদ। তিনি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার নয়াপুর জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ভুক্তভোগী সজিব আহমেদ জানান, ২৭ জুলাই সকাল ১১টা ১৯ মিনিটের দিকে তিনি আড়াইহাজার উপজেলার বান্টি বাজারে অবস্থিত ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি শাখা থেকে হাসপাতালের প্রয়োজনে ২৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। ব্যাংকের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে আনুমানিক সকাল ১১টা ৩৭ মিনিটের দিকে তিনি হাসপাতালের ম্যানেজার কাউসারকে সঙ্গে নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন।
তাদের কাছে সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ লাখ ৫ হাজার টাকা ছিল। উত্তোলন করা টাকার একটি অংশ সজিব আহমেদের কাছে এবং অন্য অংশ তার সঙ্গে থাকা ম্যানেজার কাউসারের কাছে রাখা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
সজিব আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বহনকারী সিএনজিটি বান্টি বাজার অতিক্রম করে সুবর্ণগ্রাম রিসোর্টের দিকে যাওয়ার সময় মাঝামাঝি একটি স্থানে পৌঁছালে একটি কালো রঙের প্রাইভেটকার ও একটি মোটরসাইকেল তাদের গতিরোধ করে। প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলে মোট ছয়জন ব্যক্তি ছিলেন।
ওই ব্যক্তিরা নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবির সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর তারা সজিব আহমেদ ও তার ম্যানেজারকে জোরপূর্বক সিএনজি থেকে নামিয়ে প্রাইভেটকারে তুলে নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গাড়িতে তোলার পর তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সঙ্গে থাকা প্রায় ২৫ লাখ ৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো হয়। একপর্যায়ে নরসিংদী এলাকার একটি সেতুর কাছে নিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে সড়কের পাশে ফেলে রেখে চলে যায় দুর্বৃত্তরা।

পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তারা সেখান থেকে উদ্ধার হন। ঘটনার পর সজিব আহমেদ আড়াইহাজার থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পাশাপাশি রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া তিনি গোয়েন্দা পুলিশ—ডিবি এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র্যাব কার্যালয়েও অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
সজিব আহমেদ বলেন, “হাসপাতালের প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে টাকা আনতে যাওয়ার বিষয়টি আমার ম্যানেজার ছাড়া অন্য কারও জানার কথা ছিল না। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের পথরোধ করা হয়। ফলে বিষয়টি পরিকল্পিত বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমার ধারণা, ব্যাংকের ভেতরের কেউ হয়তো টাকা উত্তোলনের তথ্য দুর্বৃত্তদের জানিয়েছে। ব্যাংকের পিয়ন, ক্যাশিয়ার কিংবা ম্যানেজারের মধ্যে কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন বলে আমি সন্দেহ করছি। তবে এটি আমার সন্দেহমাত্র। প্রশাসন সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।”
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী হাসান ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় ব্যবহৃত কালো রঙের প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ভুক্তভোগীদের বের হওয়া, তাদের অনুসরণ করা এবং পথরোধের আগে-পরে সংশ্লিষ্ট সড়কে চলাচলকারী সন্দেহভাজন যানবাহনের ভিডিও ফুটেজও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
ডিবি পরিচয় ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে কি না, নাকি এর সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পূর্বপরিচিত কেউ জড়িত রয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি। ছিনতাই হওয়া টাকাও উদ্ধার হয়নি। পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।