ভারত ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার মধ্যেই নয়াদিল্লিকে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ভারত ও ইরানের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। তবে কোনো দেশ ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করলে কিংবা দেশটির রাজস্ব আয়ের পথ তৈরি করে দিলে ওই দেশের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
কিরগিজস্তানের বিশকেকে অনুষ্ঠিত ২৬তম সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বৈঠকের পর ভারত-ইরান বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়। এর পরপরই রুবিওর এই সতর্কবার্তা সামনে এলো।
‘দ্য ব্রায়ান কিলমিড শো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কো রুবিও বলেন, ‘আসলে, আমি মনে করি না ভারত ও ইরানের মধ্যে কোনো বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে।’
তবে তিনি বলেন, বিশ্বের প্রতিটি দেশই নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এবং অনেক দেশই ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানি সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে জানান তিনি।
রুবিও বলেন, ‘প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করে এবং বিশ্বের অনেক দেশই ইরানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলে। আমরাও আলোচনার অংশ হিসেবে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর কিছু অংশের সঙ্গে দেখা করেছি এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগও হয়েছে।’
তবে ভারতসহ অন্য দেশগুলোর ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অধিকার থাকলেও তেহরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহযোগিতা করা মেনে নেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আগের সতর্কবার্তার পুনরাবৃত্তি করে রুবিও বলেন, কোনো দেশেরই ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করা উচিত নয়। একইভাবে এমন কোনো ব্যবস্থা তৈরিতেও সহযোগিতা করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে ইরান রাজস্ব আয় করতে পারে এবং সেই অর্থ সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টায় ব্যবহার করতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো দেশ যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।

ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখাকে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন রুবিও। তার ভাষায়, ‘ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না, বিশেষ করে যতদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকবেন।’
তেহরানের ওপর চাপ তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান হাতিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হলেও প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকারও ওয়াশিংটন সংরক্ষণ করে রেখেছে বলে জানান তিনি।
রুবিও বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে গেলে তাকে এর জন্য মূল্য দিতে হবে। এর প্রধান চাপ হবে অর্থনৈতিক। তবে পরিস্থিতির প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, ইরান তার জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পরিবর্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করতেই দেশটির আর্থিক সম্পদ ব্যবহার করছে।
তিনি বলেন, ‘তারা দুটি জিনিসের জন্য টাকা চায়—সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং চূড়ান্তভাবে একটি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন। আর আমরা তা হতে দিতে পারি না।’
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুমকি ও সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ‘খুবই তীব্র হামলা’ চালিয়েছে। প্রয়োজন হলে আবারও হামলা চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই দাবি করেছেন, যুদ্ধের ক্ষেত্রে তেহরান নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রেজাই বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলায় ইরানের নতুন কৌশল শিগগিরই দৃশ্যমান হবে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোকেও সতর্ক করছে ওয়াশিংটন। ফলে ভারত-ইরানের সম্ভাব্য বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা এখন শুধু দিল্লি ও তেহরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।