নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতা ও মীম শরৎ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সোহাগকে অপহরণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাতজনের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণ করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে চার্জশিট গ্রহণের পরও ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আমলি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক এম. সাইফুল ইসলাম মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। মামলার অভিযোগপত্র নম্বর ৩১৮। তদন্ত শেষে পুলিশ সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে এবং পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আরও তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে।
চার্জশিটে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন—মো. আল আমিন শেখ ওরফে জিতু, মো. কবির হালদার, লতিফ সিদ্দিকী রতন, সাব্বির আহমেদ, ইরান হোসেন মোহন, মো. সাকিব হোসেন ও মো. ছাহাদ।
মামলার নথি ও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুন রাতে ব্যবসায়িক কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজের সামনে থেকে মোহাম্মদ সোহাগকে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিভিন্ন পথে পটুয়াখালীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন ২ জুন পটুয়াখালীর পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাট এলাকা থেকে একটি গাড়ির ভেতর হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। একই ঘটনার বিষয়ে সে সময় জাতীয় গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
উদ্ধারের পর সোহাগ অভিযোগ করেন, অপহরণের সময় তাকে মারধর করা হয় এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণের বিষয়।
ঘটনার পর সোহাগের স্ত্রী তানিয়া আহম্মেদ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার নম্বর ১২(০৬)২৫। এতে দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
প্রকাশিত মামলাসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তের সময় পুলিশ বিভিন্ন আলামত, সাক্ষীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, ডিজিটাল তথ্য এবং অপহরণে ব্যবহৃত যানবাহনসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্র আদালতে গ্রহণের ফলে এখন মামলার অভিযোগগুলোর বিচারিক যাচাই শুরু হবে। আসামিরা প্রকৃতপক্ষে ঘটনায় কতটা জড়িত ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের আইনি গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু—তা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করলেও সোহাগ ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে।
ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মামলার কয়েকজন আসামি জামিনে বের হওয়ার পর মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনকি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকী রতন ও সাব্বির নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পৃথক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণের বিষয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অপহরণ মামলার কয়েকজন অভিযুক্তকে ওই এলাকায় চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা আরও পরিষ্কার হবে।
নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী নিয়মিত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
একজন ব্যবসায়ী নেতাকে শহরের ভেতর থেকে অপহরণ এবং পরবর্তী সময়ে মামলা নিয়ে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ ওঠায় ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ব্যবসায়ী মহলের প্রশ্ন, একটি বহুল আলোচিত অপহরণ মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলার সময় বাদী ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে কি না—সেটিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে রাখা প্রয়োজন।
চার্জশিট গ্রহণের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে অপহরণের ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা যাচাই হবে।
একই সঙ্গে তদন্তে তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশের ভিত্তি এবং সাতজনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে থাকা প্রমাণও বিচারিক প্রক্রিয়ায় পর্যালোচিত হবে।
মোহাম্মদ সোহাগ জানিয়েছেন, তিনি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। অন্যদিকে, মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের রায়েই নির্ধারিত হবে।
২০২৫ সালের ১ জুন নারায়ণগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া এই অপহরণকাণ্ড এক বছরের বেশি সময় পর চার্জশিট গ্রহণের মধ্য দিয়ে নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন মূল অপেক্ষা—আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঘটনার প্রকৃত চিত্র কতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে।