নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল কর বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে মানববন্ধন করেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি এবং ৭ খুনে নিহত স্বজন সহ সর্বস্তরের মানুষ।
সোমবার নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভার ভবনের সামনে সকাল দশটা থেকে বারোটা পর্যন্ত এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
একই সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম ঢাকা সিলেট মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় মানববন্ধন করেন নিহতের স্বজনরা।
মানববন্ধনে নিহতের স্বজনরা বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সময় নষ্ট না করে, লোকাল ক্ষেপণ না করে দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি জানান।

মানববন্ধনে মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমরা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছি। আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন—বাংলাদেশে সবার জন্য আইন সমান। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা মনে করি, এই ৭ হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হবে।

ইতোমধ্যে আপিল বিভাগে “লিভ টু আপিল” করা হয়েছে, এবং আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই এর শুনানি তালিকাভুক্ত হয়ে নিষ্পত্তি করা হবে। আমরা আইনমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি, অ্যাটর্নি জেনারেলের সাথেও যোগাযোগ হয়েছে,তাঁরা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে বিষয়টি দ্রুততম সময়ে তালিকায় এনে বিচার সম্পন্ন করা হবে।
এটি শুধু আমাদের ব্যক্তিগত দাবি নয়,এটি সারা বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন, এই ৭ খুনের মামলা চাঞ্চল অক্ষর এবং বহুল আলোচিত। সাতখুনের আসামিরা ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বজন হওয়ায় দীর্ঘ বিলম্ব হয়। বর্তমান সরকার এবং রাষ্ট্র রাষ্ট্র এই মামলাটি খুব গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। খুব তাড়াতাড়ি এই সাত খুন মামলার রায় কার্যকর করা হবে। এবং এই রায়ের মাধ্যমে নিহতের স্বজনরা স্বস্তি পাবে।
নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন,আমরা মনে করি, এই ঘটনার বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ আজকের বাংলাদেশ আর সেই আগের মত ফ্যাসিজম নেই,দেশ এখন একটি গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এখন একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত এই ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই—সেভেন মার্ডার হোক বা অন্যান্য হত্যাকাণ্ড—বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী, তথাকথিত ‘গডফাদার’শামীম ওসমান এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ার অভিযোগ উঠে এসেছে। অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে এগোয়নি; বরং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কিছু ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রশ্রয়ের অভিযোগ ছিল।
কিন্তু বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশে সেই ধরনের সংস্কৃতির কোনো স্থান নেই। এখন আর কোনো অপরাধীই আইনের ঊর্ধ্বে নয়,সে যত প্রভাবশালী বা শক্তিশালীই হোক না কেন।
মানববন্ধনে আরো বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, সাত খুনি নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবির, এবং সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার প্রধান সহ অনেকেই।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে এক মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম সহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। বিষয়টি দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক ইব্রাহিমকেও অপহরণ করা হয়। অপহরণের দু’দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিরচর থেকে সাত জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন ফতুল্লা থানায়। পরে আদালত আসামীদের স্বীকারোক্তি, জবানবন্দি ও স্বাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ৩৩ মাস পর জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারী রায় প্রদান করেন। রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড ও সাত জনকে ১০ বছর করে এবং ২ জনকে সাত বছর করে কারাদন্ড দেয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৮ সালে ২২ আগস্ট হাই কোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডের আদেশ বহাল রাখেন। আর বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেন। অনেকেই সাজে ভোগ করে বের হয়ে আসে।