জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করলে গণভোটকে বিনা বাক্যব্যয়ে এবং বিনা তর্কে মেনে নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, এটাই জনগণের অভিপ্রায়। জনগণ ৭০ শতাংশ ভোট দিয়ে সেই অভিপ্রায় আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
তিনি সোমবার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন দাবিতে সপ্তাহব্যাপী ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্য আয়োজিত সেমিনারের প্রধান অতিথি ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

মাহমুদুর রহমান বলেন, গণভোটকে আমি আইনগত বা সাংবিধানিক তর্ক হিসেবে দেখতে চাই না। আমি এই গণভোট এবং জুলাই সনদকে জুলাই বিপ্লবের স্প্রিটে সবসময় দেখে এসেছি।
তিনি বলেন, বিপ্লবের আগে থেকেই আমি এই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছি, এবং বিপ্লবের পর থেকে আমার বক্তব্য, লেখায় এবং কাজেকর্ম বিপ্লবের স্প্রিটিকে শতভাগ ধারণের চেষ্টা করেছি। গণভোটের আগে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আমার লেখায় ও বক্তব্যে জনগণকে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছি। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিনও আমি টিভিতে দেওয়া বক্তব্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সিল মারার কথা বলেছি। এই আবেদন থাকার কারণ ছিল-জুলাই বিপ্লবকে যদি আমরা অস্বীকার করি, তাহলেই গণভোটকে অস্বীকার করব। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, যারা আজকে গণভোটকে দুর্বল করার চেষ্টা করছেন, কিংবা গণভোটের আইনি তর্ক তুলছেন, তারা আসলে কতটা জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করেন, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। কাজেই জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করলে গণভোটকে বিনা বাক্যব্যয়ে এবং বিনা তর্কে মেনে নিতে হবে যে, এটাই জনগণের অভিপ্রায়। জনগণ ৭০ শতাংশ ভোট দিয়ে সেই অভিপ্রায় আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, যারা জীবন দিয়ে বিপ্লব করেছেন, তাদের একটি দাবি ছিল- রাষ্ট্র মেরামত করতে হবে। এটা যেন আমরা ভুলে না যাই। রাষ্ট্র মেরামত করতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে সংস্কার করতে হবে। সেই সংস্কার সরকার পরিচালনা এবং সাংবিধানিকভাবে করতে হবে। কাজেই সেই সংস্কার নিয়ে আমরা কোন তর্ক তুলতে পারব না।
তিনি বলেন, আমাদের ঘাড়ের ওপর ১৬ বছর যে ফ্যাসিবাদ চেপে বসেছিল, তার দুটো চরিত্র ছিল। একটি ফ্যাস্টি ও আরেকটি ছিল-একধরণের রাজতন্ত্র চাপিয়ে দেয়া। শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবকে দেবতা হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল, সেই দেবতার মাধ্যমে একটা অলিখিত রাজতন্ত্র কায়েমের চেষ্টা করেছিল। তার বিরুদ্ধেই আমাদের নাহিদ, সারজিসরা বিপ্লব করেছিল। তাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগান ছিল, একটি হলো-গোলামী না আজাদী…..আরেকটি হলো-দেশটা কারও বাপের না। এর অর্থই হচ্ছে, এদেশের মালিক জনগণ এবং জনগণের ইচ্ছাতেই এই দেশ পরিচালিত হবে। আর জনগণের ইচ্ছায় দেশ পরিচালিত হতে হলে গণভোটের রায় আমাদের সবাইকে মেনে নিতে হবে।

আমার দেশ সম্পাদক বলেন, এই সেমিনারে উপস্থিত সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ-দুজনই জুলাই বিপ্লবের ফসল। একইভাবে দেশের প্রধানমন্ত্রীও জুলাই বিপ্লবের ফসল। জুলাই বিপ্লবে তরুণরা এভাবে জীবন না দিলে তারা কেউ এই পদে বসতে পারতেন না। কাজেই যারা এই জুলাই বিপ্লব এবং গণভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলবো, তারা আসলে আমাদের শহীদদের অবদানকে অস্বীকার করছি। এই ভুলটা যেন আমরা না করি।
তরুণদের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘নো কিংস মুভমেন্ট’ নামে একটা আন্দোলন হচ্ছে। এর অর্থ হলো-মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প যে স্বৈরাচারের মত আচরণ করছেন, তার বিরুদ্ধে দেশটির নাগরিকরা রাস্তায় নেমেছেন। আর আমাদের তরুণরা জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ভুয়া রাজতন্ত্র খতম করে দিয়েছে। কাজেই বাংলাদেশে যেই রাজা হওয়ার চেষ্টা করুক, তা ফলপ্রসু হবে না ইনশাআল্লাহ। তরুণরা সেই চেষ্টা ফলপ্রসু হতে দেবে না।
সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি আহবান জানিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, আপনারা কোন কুতর্ক না করে গণভোটে জনগণের যে ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে, সেই ইচ্ছা মেনে নিন এবং সেই ইচ্ছা মানার জন্য যে লড়াইয়ের অংশ আয়োজিত ১১ দলের এই সেমিনারের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের যে কোন ইস্যুতে আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার পত্রিকা আপনাদের পাশে থাকবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, মানারাত ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আব্দুর রব সহ ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা এবং নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির।