হামের টিকা, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি ও আইনি লড়াইকে ইস্যু করে মাঠ গরমের চেষ্টা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন নেটওয়ার্কে পুনর্গঠনের তৎপরতা
ঢাকা: কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নতুন কৌশলে আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলটি মূল সংগঠন ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নতুন কমিটি গঠন, অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগ জোরদার এবং ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশেষ করে হামের টিকা সংক্রান্ত জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে সামনে এনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব ইস্যুকে ধীরে ধীরে বর্তমান সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ও তাদের ঘনিষ্ঠ পেশাজীবী মহল ইতোমধ্যে ড. ইউনূস ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করেছে। হাইকোর্টে রিট আবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং টকশো-পডকাস্টে অংশ নিয়ে দলটির সমর্থকরা নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন।
তবে সরকারের অবস্থান এখনো কঠোর। আওয়ামী লীগের যেকোনো ধরনের সাংগঠনিক তৎপরতা বা বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি ও গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে বড় ধাক্কা খেলেও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি। আত্মগোপনে থাকা অনেক নেতা ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ জামিনে বের হয়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। ভারতে অবস্থানরত কিছু নেতাও অনলাইনের মাধ্যমে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
জানা গেছে, দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাও নিয়মিতভাবে বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে যুক্ত হয়ে নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি অডিও বার্তায় তাকে বলতে শোনা যায়, যেখানে কমিটি নেই সেখানে নতুন কমিটি গঠন করে সংগঠিত হতে হবে। যদিও এসব অডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিভিন্ন ফেসবুক পেজে “প্রত্যাবর্তন ২.০ লোডিং” শিরোনামে পোস্টারও প্রচার করা হয়েছে। তবে দলটির অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতেই এ ধরনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল, গোপন বৈঠক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংগঠনিক তালিকা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য শোডাউন এবং “জয় বাংলা” স্লোগান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে না গিয়ে প্রথমে ড. ইউনূস ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনার মাধ্যমে জনমত তৈরির কৌশল নিয়েছে। সাংবাদিক, আইনজীবী ও পেশাজীবীদের ব্যবহার করে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি রাজনৈতিক দল প্রশাসন, পেশাজীবী সংগঠন ও স্থানীয় নেটওয়ার্কে কিছু প্রভাব রেখেই যায়। সেই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ মহল আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের প্রকাশ্য তৎপরতা উদ্বেগজনক। তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও সক্রিয় হলে এসব কর্মকাণ্ড অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।