ডুয়েটে ভিসি বিরোধে সংঘর্ষ, জাবিতে হেনস্তার প্রতিবাদে বিক্ষোভ, পবিপ্রবিতে শাটডাউন, ইবিতে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ
ঢাকা: দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উপাচার্য নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, হল ও ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে একের পর এক আন্দোলন, সংঘর্ষ ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে।
গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীদের একাংশ ‘ডুয়েট ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করছে।
সোমবার সকাল থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান নেন। এতে প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে যান।
রোববার উপাচার্য নিয়োগের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা ‘জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন’ কর্মসূচি পালন করলে বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তার একাধিক ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে নারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অশালীন অঙ্গভঙ্গি, উত্যক্ত এবং অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণের অভিযোগ ওঠে।
এসব ঘটনার প্রতিবাদে রোববার রাতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল শেষে সমাবেশে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পরে পৃথক তিন ঘটনায় তিনজনকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত, অশালীন মন্তব্য এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের পদত্যাগ দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে উপাচার্যের কার্যালয় ও বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়েছে।

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসে এক জুনিয়র শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। লোকপ্রশাসন বিভাগ এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও আহত হন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, দলীয় প্রভাব, শিক্ষার্থী রাজনীতি এবং নিরাপত্তা সংকট এখন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বিশেষ করে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবও অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। ফলে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থিতিশীলতা ফেরানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।