সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেছে ভিওডি বাংলা। তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভুল তথ্য, অপতথ্য, গুজব, ডিপফেক ভিডিও এবং গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্টদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
বিশ্লেষণে বিশেষভাবে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন কনটেন্ট পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম ‘বাংলাফ্যাক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে দাবি করা হয়, মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, “একটা মাস গাড়ি ছাড়া চলুন, হাঁটাহাঁটি করলে শরীর ভালো থাকে।”
বাংলাফ্যাক্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, মন্ত্রী এমন কোনো মন্তব্য করেননি। মূলত একটি সার্কাজম পেজের পোস্টকে বাস্তব বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা হয়।
এ ছাড়া, “মন্ত্রী পরিষদ থেকে শেখ রবিউল আলমকে অপসারণ করা হতে পারে”—এমন দাবিও কয়েকটি নিবন্ধনহীন অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনুসন্ধানে এ দাবির কোনো সরকারি ভিত্তি পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তিনি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবেই দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে “পদ্মা সেতুর পিলারের নিচের মাটি চুরি হচ্ছে”—শিরোনামে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। ভিওডি বাংলার দাবি, ভিডিওতে দেখানো মাটি ও নির্মাণসামগ্রী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছিল। সেটিকেই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে অপপ্রচার চালানো হয়।
সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষা-সংক্রান্ত ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনের পেছনেও অপপ্রচার ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে একটি অডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, তিনি শিক্ষার্থীদের “ফার্মের মুরগি” বলেছেন। এ নিয়ে প্রতিবাদও হয়।
পরবর্তীতে সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি একটি অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগত ফোনালাপে অন্য প্রসঙ্গে ওই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, যা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ছিল না।
এ ছাড়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা স্থগিত, সময় পরিবর্তন কিংবা নতুন রুটিন প্রকাশের নামে বিভিন্ন ভুয়া পোস্ট ছড়িয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করা হয়। শিক্ষা প্রশাসন এসব গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে কেবল সরকারি সূত্রের তথ্য অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনা এবং আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ইস্যুতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে ঘিরেও বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামের টিকা অনুমোদনের বিষয়টি বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট প্রচার করা হলেও ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এসব দাবির কোনো সরকারি ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
এদিকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে নতুন করে নানা অভিযোগ ছড়ানো হয়। এক পর্যায়ে নরসিংদীর এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। এরপর বিভিন্ন ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে তার বিরুদ্ধে অর্থ দাবি করার অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ফ্যাক্টচেকাররা অপতথ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পরে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির মগবাজার শাখার কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় সরকার।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরেও সামাজিক মাধ্যমে একাধিক অপপ্রচারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া তার হলফনামা ও পারিবারিক ব্যবসার তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে সম্পাদনা করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, তার নামে ১ হাজার ৮২৪ শতাংশ সম্পত্তি এবং ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। কিন্তু সম্পাদিত সংস্করণে মাত্র ৩১ শতাংশ সম্পত্তির তথ্য দেখিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়।
এ ছাড়া, প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বার্থের সংঘাত এড়াতে পারিবারিক ব্যবসার মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা থেকে লিখিতভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনা করছেন পরিবারের অন্য সদস্যরা।
পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে নতুন করে ২৪২ শতাংশ জমি কেনার দাবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও প্রতিমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান তা ভুয়া বলে জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বগুড়া সফরকে কেন্দ্র করে বাগবাড়ি এলাকার একটি কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো এবং সফর শেষে তা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সাময়িকভাবে ইট বিছানো হয়েছিল। সফর শেষে ইট সরিয়ে সেখানে স্থায়ী উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে। তিনি সংবাদ প্রকাশের আগে সঠিক তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট তিনজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত যেকোনো তথ্য শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ছয় মাসের কর্মমূল্যায়নকে সামনে রেখে পরিকল্পিতভাবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভুয়া বক্তব্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তাদের ধারণা, প্রশাসনের প্রতি জনআস্থায় ফাটল ধরানো এবং দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাই এসব অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য।