দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নতুন করে পাঁচ বছর মেয়াদি ‘পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু চমক রাখতে চায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। মূলত দুর্নীতি কমিয়ে অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো মূল লক্ষ্য আসছে বাজেটে। কর আদায়ে আসবে একাধিক নতুন কৌশল। সব নাগরিককে আনা হবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতায়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানালেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার চেষ্টা চলছে জোরেশোরে। এ কাঠামোর মাধ্যমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এতে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে এ পরিকল্পনা দেশের আর্থিক খাতকে একটি ভিত্তি তৈরি করতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি ভবনের সম্মেলন কক্ষে অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগকে (জিইডি) প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে গঠিত অ্যাডভাইজরি কমিটির প্রথম সভায় এসব তথ্য জানানো হয়। সভা সূত্রে জানা যায়, সরকার পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে গঠিত অর্থনৈতিক অ্যাডভাইজরি কমিটি এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ ও নীতিগত সুপারিশ তৈরি করছে। কমিটির প্রথম সভায় এসব সুপারিশের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারের নতুন এ পরিকল্পনায় ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক জিডিপি ১ ট্রিলিয়নে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া এফডিআই দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশে বৃদ্ধি করা, বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৫ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের অনিয়ম তদন্ত ও জড়িতদের শাস্তি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশ উন্নীত করা, ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিলুপ্ত, উদারীকরণ নীতি নেয়ার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এছাড়া বেসরকারি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। আইসিটি, ব্লু-ইকোনমি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ট্যুরিজম, ডিজিটাল ইকোনমি এবং অঞ্চলভিত্তিক ক্যাপিটাল বৃদ্ধির প্রতি নীতি সহায়তার কথা সুপারিশে বলা হয়েছে।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকারের নির্বাচনী ইশতাহার বাস্তবায়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করে জিইডি। বিগত সময়ে প্রায় আটটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হাতে নেয় সরকার। তবে এসব পরিকল্পনায় নেয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবতাবিবর্জিত ও বয়াননির্ভর ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল এমন অভিযোগও অর্থনীতিবিদের। তবে এবার একটি বাস্তবতানির্ভর, বাস্তবায়নযোগ্য ও জনসম্পৃক্ত একটি পরিকল্পনা নিতে চায় সরকার। সে লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নে দুটি কমিটি গঠন করা হয়। এর একটি অ্যাডভাইজরি কমিটি, যেখানে সভাপতি হিসেবে রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। এ কমিটিতে দেশের অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষাবিদদের রাখা হয়েছে।
সভায় পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো প্রণয়নে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। তার মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ, বেসকারি খাতের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত, বৈষম্য দূরীকরণ এবং শাসন ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।
নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে অ্যাডভাইজরি কমিটি। নতুন নাম হিসেবে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামোর সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় তিনটি মূল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। অ্যাডভাইজরি কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘সরকার অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় তিনটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে চায়। অতীতে প্রণীত পরিকল্পনা ও পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর অমিল ছিল, যা এখন মূল্যায়নের আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে যা বাস্তবায়নযোগ্য এবং জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে সবার প্রয়োজন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমন্বয় ঘটিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণই হবে সরকারের অগ্রাধিকার। অর্থনৈতিক কৌশল তখনই কার্যকর হয় যখন তা বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু অতীতে দেশের অনেক পরিকল্পনাই ছিল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, বাস্তবতাবিবর্জিত এবং কেবল কিছু সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।’
একটি বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা করা হচ্ছে জানিয়ে জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার তাদের ইশতাহার রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। এটি আগের মতো না করে জনসম্পৃক্ত ও বাস্তবধর্মী করতে চাই। সেজন্য আমাদের বিশেষজ্ঞ কমিটি কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করছে। এটি বাজেটের দিন প্রকাশ করতে কাজ চলছে।’
সভায় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, কমিটির সদস্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্, সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরসহ কমিটির সদস্যরা।
