টাইমের বিশেষ প্রতিবেদন তারেক রহমান
দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন?
সতেরো বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। ফিরে আসার সাত সপ্তাহ পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। এখন বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘টাইম’ তারেক রহমানকে নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, তার এই উত্থান বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বরাজনীতিতে কীরূপ প্রভাব ফেলবে?
সাময়িকীটি নিবন্ধে বলছে, বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, তারেকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়।

গত জানুয়ারির শুরুতে টাইম ম্যাগাজিন তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছিল। সে সময় তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে নতুন করে গড়ে তোলা এবং সমাজে সৃষ্টি হওয়া বিভাজন দূর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছিলেন।
টাইম তাকে প্রশ্ন করেছিল কী কী বিষয় অগ্রাধিকারপাবে? তিনি বলেছেন, ‘প্রথমত, আইনের শাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়ত, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যে রাজনৈতিক কর্মসূচিই দিই না কেন, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টাইমের বিশেষ সাক্ষাৎকার থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো

জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা
২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। এ ছাড়া শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষত এখনো তাজা। হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সেনাবাহিনী, আদালত, প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষকে ঐক্যের বার্তা এবং প্রতিশোধ না নেওয়ার অঙ্গীকার করে আসছেন। নিজের এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে এবং দেশে শান্তি বজায় রাখতে তাকে এখন নিরলসভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধ কিছুই ফিরিয়ে আনবে না। বরং যদি আমরা এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তাহলে ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব।’
অর্থনীতির পুনর্গঠন
হাসিনার শাসনক্ষমতার শেষ সময়ে বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি দেশ ছিল। ২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন ডলার জিডিপি থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে মূল্যস্ফীতি, বৈষম্য ও যুব বেকারত্ব বৃদ্ধির ফলে ক্ষোভ বাড়ে।
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল টাকা সাধারণ মানুষের বাস্তব আয় কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অথচ তরুণদের ১৩ দশমিক ৫ শতাংশই বেকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানি সীমিত হয়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
চার কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যে বাস করছে। বিএনপির একটি প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ সহায়তা প্রদান। তবে এর অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তারেক রহমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করতে সংযোগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের কথাও বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ভাষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দিতে পারি।’

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন
রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির কারণে আঞ্চলিক শক্তি ভারত এবং প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে। হাসিনার পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। তিস্তা নদীর পানিবণ্টনসহ বেশ কিছু বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বিএনপি ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ পানি কনভেনশনে স্বাক্ষরের কথা বলেছে, যাতে ‘ন্যায্য পানির প্রাপ্যতা’ নিশ্চিত করা যায়।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা অবশ্যই প্রতিবেশী। তবে বাংলাদেশের স্বার্থই আগে।’
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও আলোচনা সাপেক্ষে তা ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। মার্কিন পণ্য আমদানির সুযোগ বাড়ানো এবং মার্কিন তুলা ব্যবহার করা তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আরও শুল্ক সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনার কথাও বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একে অপরকে সহায়তা করতে পারি।’

ইসলামপন্থার উত্থান
নির্বাচনে বিএনপি ছাড়াও প্রধান সুবিধাভোগী হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। যাদের ওপর হাসিনা আমলের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। দলটি শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রাখলেও সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
খুব শীতে পিঠ ব্যথা করে, কারাগারে নির্যাতনের ফল: তারেক রহমানখুব শীতে পিঠ ব্যথা করে, কারাগারে নির্যাতনের ফল: তারেক রহমান
তবে সমালোচকদের মতে, দলটির অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নারীর অধিকার নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
যদিও বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে, তবুও জামায়াত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে থাকবে। তারেক রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় না ফিরি।’
ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ
হাসিনার পতন ঘটানো আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ছাত্রদের হাত ধরে। পরবর্তী সময় তা ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তবে নির্বাচনে ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর আধিপত্যে অনেক তরুণ হতাশ।
প্রাক্তন ছাত্রনেত্রী তাসনিম জারা বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক বিকল্পের সম্ভাবনা আছে, তবে তা রাতারাতি আসবে না। স্থানীয় পর্যায়ে সৎ ও নীতিবান নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেছেন, ‘যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের বড় দায়িত্ব রয়েছে।’